আমার সঞ্চয়ী হিসাবের স্টেটমেন্ট খুলে একদিন সুদের হারটা খুঁজছিলাম। পুরো পাতায় জমা, উত্তোলন আর ব্যালেন্স আছে, কিন্তু কত শতাংশে সুদ পাচ্ছি, সেই সংখ্যাটা কোথাও নেই। শেষে গুগলে খুঁজে একটা আভাস পেলাম, ৩ থেকে ৪ শতাংশ, যেটাকে নিশ্চিত তথ্য বলা যায় না। নিজের টাকা কত হারে খাটছে, তা-ই জানি না, এটা অদ্ভুত লাগছিল।
ডিপিএস নিয়ে লিখতে বসে ওই অভিজ্ঞতাটাই বারবার মনে পড়ছে। কারণ ডিপিএস আসলে ঠিক এই প্রশ্নেরই উত্তর: নিয়ম করে প্রতি মাসে একটা অঙ্ক জমান, ব্যাংক একটা জানা হারে মুনাফা যোগ করে, আর মেয়াদ শেষে সবটা একসঙ্গে ফেরত দেয়। নামটা Deposit Pension Scheme-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে চালু। যদিও নামে পেনশন আছে, এটা পেনশন নয়, ব্যাংকের একটা মাসিক সঞ্চয় স্কিম। এই লেখায় আমি সংখ্যা ধরে ধরে দেখাব, মাসে কত জমালে শেষে কত হয়, কর কত কাটে, আর কোথায় কোথায় মানুষ ভুল করে।
একটা কথা আগেই বলে নিই। এখানকার সব হিসাব অক্টোবর ২০২৬-এর প্রচলিত হারের একটা পরিসর ধরে করা, নির্দিষ্ট কোনো ব্যাংকের চার্ট নয়। হার ব্যাংক ও সময়ভেদে বদলায়, তাই এগুলোকে আপনার সিদ্ধান্তের কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করুন, চূড়ান্ত সংখ্যা ব্যাংক থেকেই নিন।
মাসে ১,০০০ টাকা, ৫ বছর: হাতে আসলে কত আসে
সবচেয়ে সহজ উদাহরণটা দিয়েই শুরু করা যাক। ধরা যাক ব্যাংক বছরে ৮ শতাংশ মুনাফা দিচ্ছে এবং আপনি ৫ বছরের ডিপিএসে প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা জমাচ্ছেন। ৬০ মাসে আপনার নিজের পকেট থেকে যায় ৬০,০০০ টাকা। মেয়াদ শেষে হাতে আসে আনুমানিক ৭৩,৯৬৭ টাকা। অর্থাৎ ১৩,৯৬৭ টাকাটা ব্যাংকের যোগ করা মুনাফা।
একটা জিনিস এখানে খেয়াল করার মতো। প্রথম মাসের কিস্তিটা পুরো ৬০ মাস ধরে মুনাফা কামাচ্ছে, আর শেষ মাসেরটা কামাচ্ছে মাত্র এক মাস। এই কারণেই মেয়াদ বাড়ালে অঙ্কটা সমানুপাতে না বেড়ে লাফিয়ে বাড়ে। নিচের হিসাবটা সেটাই দেখায়।
| মেয়াদ | আপনি দিলেন | হাতে এল (আনুমানিক) | মুনাফা | কর বাদে মুনাফা |
|---|---|---|---|---|
| ৩ বছর | ৩৬,০০০ টাকা | ৪০,৮০৬ টাকা | ৪,৮০৬ টাকা | ৪,৩২৫ টাকা |
| ৫ বছর | ৬০,০০০ টাকা | ৭৩,৯৬৭ টাকা | ১৩,৯৬৭ টাকা | ১২,৫৭০ টাকা |
| ৮ বছর | ৯৬,০০০ টাকা | ১,৩৪,৭৬১ টাকা | ৩৮,৭৬১ টাকা | ৩৪,৮৮৫ টাকা |
| ১০ বছর | ১,২০,০০০ টাকা | ১,৮৪,১৬৬ টাকা | ৬৪,১৬৬ টাকা | ৫৭,৭৪৯ টাকা |
৩ বছর থেকে ১০ বছরে গেলে আপনার জমা বাড়ে সাড়ে তিন গুণের কম। কিন্তু মুনাফা বাড়ে তেরো গুণেরও বেশি। ছোট কিস্তি বড় মেয়াদে তাই অনেক বেশি কাজ করে, যদি আপনি টিকে থাকতে পারেন। এই “যদি”টাই আসল প্রশ্ন, যেটায় একটু পরে আসছি।
হিসাবের পদ্ধতিটা বলে রাখি: প্রতি মাসের শুরুতে কিস্তি জমা এবং মাসিক চক্রবৃদ্ধি ধরেছি। ব্যাংক ত্রৈমাসিক বা অন্য পদ্ধতিতে গণনা করলে কয়েক টাকার ফারাক হবে। এই ওয়েবসাইটের ডিপিএস ক্যালকুলেটর বানাতে গিয়ে আমি নিজেই দেখেছি, শুধু চক্রবৃদ্ধির পদ্ধতি বদলালেই শেষ অঙ্ক সামান্য নড়ে যায়। নিজের কিস্তি আর মেয়াদ বসিয়ে দেখতে চাইলে FDR ও DPS ক্যালকুলেটর ব্যবহার করুন, আর সুদের ওপর সুদের ব্যাপারটা আলাদাভাবে বুঝতে চাইলে চক্রবৃদ্ধি সুদ ক্যালকুলেটর আছে।
৫০০ টাকা আর ৫,০০০ টাকার মধ্যে আসল পার্থক্য কোথায়
মাসে ৫০০ টাকা জমানো একজন শিক্ষার্থী আর মাসে ৫,০০০ টাকা জমানো একজন চাকরিজীবীর কথা ভাবুন। দুজনেই ৫ বছরের ডিপিএস করলেন, ৮ শতাংশ হারে। প্রথমজন মোট জমা দিলেন ৩০,০০০ টাকা, মেয়াদ শেষে পেলেন আনুমানিক ৩৬,৯৮৩ টাকা। দ্বিতীয়জন জমা দিলেন ৩,০০,০০০ টাকা, পেলেন প্রায় ৩,৬৯,৮৩৪ টাকা। ২,০০০ টাকার কিস্তিতে ওই পাঁচ বছরে হাতে আসে ১,৪৭,৯৩৩ টাকা, আর ১০,০০০ টাকার কিস্তিতে ৭,৩৯,৬৬৭ টাকা।
সংখ্যাগুলো দেখে মনে হতে পারে, বড় কিস্তিই একমাত্র পথ। আমি অন্যভাবে দেখি। প্রথমজনের ৩৬,৯৮৩ টাকা তাঁর জীবনের প্রথম নিজের জমানো অঙ্ক হতে পারে, আর সেই অভিজ্ঞতাই পরের বড় কিস্তির সাহস জোগায়। সঞ্চয়ের হারটা (আয়ের কত শতাংশ জমাচ্ছেন) অঙ্কের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ৫০০ টাকা যদি আপনার আয়ের ১০ শতাংশ হয়, সেটাই ঠিক শুরু, আর ১০,০০০ টাকা যদি আয়ের ৬০ শতাংশ হয়, সেটা টিকবে না।
সুদের হার আসলে কত, আর কেন সেটা না জেনে খোলা বিপজ্জনক
২০২৬ সালে বিভিন্ন ব্যাংকের রেট-তালিকা সংকলনে ডিপিএসের মুনাফার হার সাধারণত ৭ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। কোথাও এর একটু ওপরে বা নিচে। সঞ্চয়ী হিসাবে একই সময়ে সুদ সাধারণত ৩ থেকে ৫ শতাংশের কাছাকাছি। আমি এখানে কোনো ব্যাংকের নাম ধরে “সেরা” তালিকা দিইনি, ইচ্ছে করেই। ডিপিএসের হার ঘন ঘন বদলায়, আর অনলাইনে ছড়ানো তালিকার বড় অংশই পুরোনো বা অসম্পূর্ণ। আপনি যে ব্যাংকের তালিকা মুখস্থ করে যাবেন, সেখানে গিয়ে অন্য হার শুনলে বিভ্রান্তি ছাড়া কিছু বাড়বে না।
তবে হারের ফারাকটা কতটা বড়, সেটা একবার চোখে দেখা দরকার। মাসে ১,০০০ টাকা করে ৫ বছর জমালে ৪ শতাংশ হারে মেয়াদ শেষে আসে ৬৬,৫২০ টাকা, আর ৮ শতাংশে ৭৩,৯৬৭ টাকা। তফাত ৭,৪৪৭ টাকা। ১০ বছরে সেই তফাত দাঁড়ায় ৩৬,৪২৫ টাকায় (১,৪৭,৭৪১ বনাম ১,৮৪,১৬৬)। কেউ যদি পরিচিত ব্যাংক বলে হার না দেখেই একটা ডিপিএস খুলে ফেলে, তাহলে সে নিজের অজান্তে এই টাকাটাই ছেড়ে দিচ্ছে।
আমার সঞ্চয়ী হিসাবের গল্পটা এখানেই কাজে লাগে। স্টেটমেন্টে হার না থাকলে ইন্টারনেটের আভাসের ভরসায় বসে না থেকে শাখায় গিয়ে লিখিতভাবে জেনে নেওয়াই ঠিক। ডিপিএসের ক্ষেত্রে আমি তাই আরও কড়া: হার, মেয়াদ আর মাঝপথে ভাঙার শর্ত, এই তিনটি জিনিস কাগজে নিয়ে তারপর কিস্তি জমা দেওয়া।
২০২৬-এর ব্যাংক বাজারে ডিপিএসের হার কোন দিকে যেতে পারে
একটা সম্পাদকীয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায়, অথচ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমেছে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে, যা ১৯৯৩ সালের পর সর্বনিম্ন। সহজ ভাষায়, ব্যাংকের হাতে টাকা আছে অনেক, কিন্তু সেই টাকা ধার নেওয়ার লোক কম।
এ থেকে একটা অনুমান করা যায়, তবে অনুমানটা আমার, নিশ্চিত তথ্য নয়: হাতে এত অলস টাকা থাকলে ব্যাংকগুলো নতুন আমানতের জন্য আগের মতো উঁচু হার দিতে নাও চাইতে পারে। হার কমবে কি না কেউ নিশ্চিত বলতে পারে না। কিন্তু এই সম্ভাবনা মাথায় রেখে একটা প্রশ্ন আগেই করে নেওয়া জরুরি: আপনি যে হারে ডিপিএস খুলছেন, সেটা কি পুরো মেয়াদে স্থির থাকবে, নাকি ব্যাংক বছর বছর বদলাতে পারে? আগের ছয় প্রশ্নের তালিকায় এটাই প্রথম প্রশ্ন, আর এর উত্তরটা সবচেয়ে মূল্যবান।
মুনাফা থেকে কর কাটে, কিন্তু কতটা
ব্যাংক আমানতের সুদের ওপর ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে ব্যাংক নিজেই উৎসে কর কেটে রাখে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে হারটা এভাবে পাওয়া যায়: টিআইএন দেওয়া থাকলে ১০ শতাংশ, না দিলে ১৫ শতাংশ। আগের উদাহরণেই ফিরি। ১,০০০ টাকা কিস্তি, ৫ বছর, মোট মুনাফা ১৩,৯৬৭ টাকা। টিআইএন থাকলে প্রায় ১,৩৯৭ টাকা কর কাটে, হাতে থাকে ১২,৫৭০ টাকা। না থাকলে ২,০৯৫ টাকা কাটে, হাতে থাকে ১১,৮৭২ টাকা। শুধু একটা কাগজ না থাকার জন্য প্রায় ৭০০ টাকা বাড়তি চলে গেল।
এই প্রসঙ্গে একটা ব্যক্তিগত কথা না বললে অসৎ হবে। আমার নিজের টিআইএন সার্টিফিকেট এখনো নেই। অর্থাৎ আমি যদি আজ একটা ডিপিএস খুলতাম, উৎসে কর আমারও ১৫ শতাংশের হিসাবে কাটার সম্ভাবনা ছিল। কথাটা লিখছি কারণ অনেক শিক্ষার্থী আর তরুণ আয়কারী ভাবেন, টিআইএন বুঝি কেবল যাঁরা কর দেন তাঁদের জিনিস। বাস্তবে সুদের টাকায় ভাগ বসাতেও এর ভূমিকা আছে।
উৎসে করের বাইরে আছে আবগারি শুল্ক। ব্যাংক হিসাবের ব্যালেন্স সরকার নির্ধারিত সীমা ছাড়ালে বছর শেষে ব্যালেন্সের স্ল্যাব অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক কেটে নেওয়া হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী এটা চলমান আর স্থায়ী, দুই ধরনের আমানতেই খাটে। ডিপিএসের জমা বাড়তে বাড়তে একদিন সেই সীমা ছুঁতে পারে। স্ল্যাবের অঙ্ক বাজেটে বদলায়, তাই বর্তমান সীমা ব্যাংকের কাছ থেকে জেনে নিন। করের বিস্তারিত অঙ্কের জন্য আমাদের আয়কর ক্যালকুলেটর একটা মোটামুটি ধারণা দেবে, তবে চূড়ান্ত হিসাব এনবিআরের নিয়ম বা কর পরামর্শকের কাছেই নির্ভরযোগ্য।
যে জিনিসগুলো ক্যালকুলেটরের হিসাবে ধরা থাকে না
ওপরে দেখানো সব অঙ্ক, এমনকি আমাদের ক্যালকুলেটরের ফলাফলও, একটা সাদামাটা ধারণা দেয়। বাস্তবে চারটা জিনিস অঙ্কটাকে বদলে দিতে পারে। প্রথমটা উৎসে কর, যেটা আমরা দেখলাম। দ্বিতীয়টা আবগারি শুল্ক, যেটা ব্যালেন্স বড় হলে বছর শেষে কাটে। তৃতীয়টা ব্যাংকের গণনা পদ্ধতি, মাসিক না ত্রৈমাসিক চক্রবৃদ্ধি, যেটা শেষ অঙ্কে কয়েক টাকা থেকে কয়েক শ টাকার ফারাক ঘটায়। চতুর্থটা কিস্তি জমা দেওয়ার তারিখ, কারণ মাসের কোন দিনে জমা হলো, তার ওপর সামান্য মুনাফার হিসাব নির্ভর করে।
নিজের হিসাবটা বাস্তবের কাছাকাছি আনতে একটা সহজ উপায় আছে। ক্যালকুলেটরে যে মুনাফা আসে, তার থেকে ১০ শতাংশ (টিআইএন থাকলে) বা ১৫ শতাংশ (না থাকলে) বাদ দিন। তারপর সেই নিট অঙ্ক আপনার ব্যাংকের লিখিত চার্টের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। দুটোর মধ্যে বড় ফারাক থাকলে ব্যাংককে জিজ্ঞেস করুন, কোন পদ্ধতিতে তারা হিসাব করে। এই প্রশ্ন করতে লজ্জার কিছু নেই, কারণ আপনার টাকার হিসাব আপনার জানার অধিকার।
কিস্তি কত রাখবেন: লক্ষ্য থেকে উল্টো হিসাব
বেশিরভাগ মানুষ কিস্তি ঠিক করেন উল্টো পথে: “আমি কত দিতে পারি?” দিয়ে শুরু করে। আমার মনে হয় দুটো প্রশ্নই লাগে। কত লাগবে, আর কত দিতে পারব। প্রথমটার উত্তর পেতে ধরুন পাঁচ বছর পর আপনার ৫ লাখ টাকা দরকার, সন্তানের ভর্তি বা বাড়ির ডাউনপেমেন্টের জন্য। ৮ শতাংশ হারে মাসে প্রায় ৬,৭৬০ টাকা জমালে এই অঙ্কে পৌঁছানো যায় (মোট জমা ৪,০৫,৬০০ টাকা)। ৩ লাখ চাইলে লাগে প্রায় ৪,০৫৬ টাকা, আর ১ লাখ চাইলে ১,৩৫২ টাকা। এই হিসাবে করের প্রভাব ধরিনি, তাই নিট অঙ্ক চাইলে কিস্তি একটু বাড়িয়ে ধরা ভালো।
এবার দ্বিতীয় প্রশ্নটা। ডিপিএসের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো সামর্থ্যের চেয়ে বড় কিস্তি বেছে নেওয়া। উৎসাহের মাথায় ১০,০০০ টাকার কিস্তি ঠিক করলেন, আট মাস পর হঠাৎ খরচ বাড়ল, কিস্তি আর দিতে পারছেন না। তখন ডিপিএস ভাঙতে হয়, আর মাঝপথে ভাঙলে সাধারণত কম হারে মুনাফা পান। তার চেয়ে ছোট অঙ্কে শুরু করা ভালো। আয় বাড়লে আরেকটা আলাদা ডিপিএস খুলে ফেলা যায়। আমি লক্ষ্য করেছি, একটা বড় কিস্তির বদলে দুটো ছোট কিস্তি অনেক সময় সামলানোও সহজ, কারণ একটাতে সমস্যা হলে অন্যটা চলতে থাকে।
কিস্তিটা মাসের কোন তারিখে কাটবে, সেটাও ঠিক করুন
ডিপিএস চালিয়ে যাওয়া মানুষের একটা সাধারণ অভ্যাস চোখে পড়ে: তাঁরা কিস্তিটাকে “বাকি টাকা থেকে” নয়, আয় আসার সঙ্গে সঙ্গে আগে সরিয়ে রাখেন। বেতন বা আয়ের টাকা ঢোকার ঠিক পরের দিন বা দুদিন পরে কিস্তির তারিখ রাখলে মাসের শেষে “আর কিছু বাকি নেই” অজুহাতটা তৈরিই হয় না। উল্টো পথে, মাসের শেষে যা বাঁচে তা জমানোর চেষ্টা করলে বেশিরভাগ মাসেই কিছু বাঁচে না।
ফ্রিল্যান্সার বা ব্যবসায়ী, যাঁদের আয় প্রতি মাসে সমান আসে না, তাঁদের জন্য এই কৌশলটা একটু বদলে নিতে হয়। প্রতিটি পেমেন্ট হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার একটা নির্দিষ্ট অংশ, ধরুন ১০ শতাংশ, আলাদা একটা হিসাবে সরিয়ে রাখা যায়, আর সেই হিসাব থেকেই ডিপিএসের কিস্তি কাটে। এতে খারাপ মাসেও কিস্তি আটকায় না। কিস্তি কোন তারিখে কাটবে আর কোন হিসাব থেকে কাটবে, দুটোই অটো-ডেবিটে বেঁধে দিন।
সন্তানের নামে ডিপিএস: অভিভাবকদের যা ভাবা দরকার
অনেক অভিভাবক সন্তানের পড়াশোনা বা ভবিষ্যতের জন্য ডিপিএস খুলতে চান। কিছু ব্যাংকে শিশুদের শিক্ষার জন্য আলাদা মাসিক সঞ্চয় স্কিমও আছে, যেখানে অভিভাবক বা আইনি অভিভাবকের মাধ্যমে হিসাব খোলা যায়। এর শর্ত, বয়সসীমা ও কাগজপত্র ব্যাংকভেদে আলাদা, তাই সরাসরি শাখা থেকে জেনে নেওয়া দরকার।
এখানে একটা হিসাব মাথায় রাখা ভালো। সন্তানের বয়স যত কম, মেয়াদ তত দীর্ঘ রাখার সুযোগ। ১০ বছরের ডিপিএসে মাসে ১,০০০ টাকা করে জমালে ৮ শতাংশ হারে হাতে আসে প্রায় ১,৮৪,১৬৬ টাকা, যেটা কোনো ভর্তি বা উচ্চশিক্ষার প্রাথমিক খরচের একটা অংশ সামলাতে পারে। তবে শিক্ষার খরচ সাধারণত মূল্যস্ফীতির চেয়েও দ্রুত বাড়ে, তাই শুধু ডিপিএসের ওপর নির্ভর না করে অন্য সঞ্চয়ের সঙ্গে মিলিয়ে পরিকল্পনা করাই বুদ্ধিমানের।
ডিপিএস খুলতে কী লাগে, আর কোথায় যেতে হয়
প্রক্রিয়াটা তুলনামূলক সোজা। আগে একটা ব্যাংক আর স্কিম ঠিক করতে হয়। ব্যাংকে আপনার একটা সচল সঞ্চয়ী বা চলতি হিসাব থাকলে মাসিক কিস্তি সেখান থেকেই কাটা যায়। না থাকলে ডিপিএসের সঙ্গে নতুন হিসাব খুলতে হতে পারে। তারপর শাখায় গিয়ে, কিংবা ব্যাংকের অ্যাপে সুবিধা থাকলে সেখান থেকে, আবেদন। কিছু ব্যাংকে অ্যাপ থেকেই ডিপিএস খোলা যায়, কিছুতে এখনো শাখায় যেতে হয়, তাই যাওয়ার আগে ফোন করে জেনে নেওয়াটা সময় বাঁচায়।
সাধারণত লাগে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, পাসপোর্ট সাইজ ছবি, নমিনির তথ্য ও ছবি, আর টিআইএন সার্টিফিকেট, যদি থাকে। অনেকের প্রশ্ন থাকে, টিআইএন ছাড়া কি ডিপিএস খোলা যায়। সাধারণত যায়, তবে ওপরের হিসাবে দেখলাম, তখন কর বেশি কাটে। কিস্তির পরিমাণ সাধারণত মাসে ৫০০ টাকা থেকে শুরু হয়। সর্বোচ্চ সীমা ব্যাংকভেদে ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা। মেয়াদের বিকল্প মোটামুটি ৩, ৫, ৮ বা ১০ বছর, কিছু ব্যাংকে ৪, ৬, ৭ বা ১২ বছরও আছে।
একটা ছোট কৌশল আছে, যেটা অনেকে খোলার দিন ভুলে যান: অটো-ডেবিট বা স্থায়ী নির্দেশনা চালু করে নেওয়া। কিস্তির তারিখ মনে রাখার ওপর নির্ভর করলে এক-দুই মাস দেরি হওয়াটা সময়ের ব্যাপার। দেরি হলে সাধারণত ছোট জরিমানা লাগে, আর বারবার হলে ডিপিএস বন্ধও হয়ে যেতে পারে। সঙ্গে লিংক হিসাবে সবসময় কিস্তির অঙ্কের চেয়ে বেশি ব্যালেন্স রাখুন, নইলে অটো-ডেবিট ব্যর্থ হয়ে জরিমানা গোনা লাগে।
শরিয়াহ মেনে চলতে চাইলে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে সুদের বদলে মুদারাবা নীতিতে চলা মাসিক সঞ্চয় স্কিম আছে। নাম ও মুনাফা বণ্টনের নিয়ম ব্যাংকভেদে আলাদা, তাই স্কিমের শর্ত ভালো করে পড়ে তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
সতর্কতা: ব্যাংকের বাইরে কেউ “ডিপিএস” বা “সঞ্চয় প্রকল্প” নাম দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে টাকা তুলতে চাইলে এবং অস্বাভাবিক বেশি মুনাফার কথা বললে দূরে থাকুন। বৈধ ডিপিএস সবসময় ব্যাংকের হিসাব আর ব্যাংকের রসিদের মাধ্যমে চলে।
ব্যাংক বাছাই: ছয়টা প্রশ্ন, উত্তরগুলো কাগজে লিখে নিন
কোন ব্যাংকের ডিপিএস সবচেয়ে ভালো, এই প্রশ্নের কোনো স্থায়ী উত্তর নেই। যে ব্যাংকের হার আজ ভালো, সেটা ছয় মাস পর নাও থাকতে পারে। তাই ব্যাংকের নামের ওপর নির্ভর না করে ব্যাংককে প্রশ্ন করাটাই বেশি কাজের। দুই-তিনটি ব্যাংকে গিয়ে একই প্রশ্নগুলো করুন, আর উত্তরগুলো লিখিতভাবে নিন, কারণ মুখের কথা মেয়াদের শেষে কেউ মনে রাখে না।
শাখায় গিয়ে এই ছয়টা প্রশ্ন করুন:
- আমার কিস্তি ও মেয়াদে বর্তমান বার্ষিক মুনাফার হার কত, আর এটা কি পুরো মেয়াদে স্থির থাকবে নাকি বদলাতে পারে?
- মুনাফা মাসিক না ত্রৈমাসিক হিসেবে যুক্ত হয়, আর মেয়াদ শেষে কত পাব তার লিখিত চার্ট পাব কি না?
- কিস্তি দেরিতে জমা দিলে জরিমানা কত, আর কয়টি কিস্তি বাদ গেলে ডিপিএস বাতিল হয়?
- মেয়াদের আগে ভাঙলে কোন হারে মুনাফা পাব, আর কোনো কর্তন আছে কি না?
- জমার বিপরীতে ঋণ নেওয়া যায় কি না, গেলে কত শতাংশ পর্যন্ত আর কী সুদে?
- অ্যাপ বা অনলাইনে কিস্তি দেওয়া ও স্টেটমেন্ট দেখার সুবিধা আছে কি না?
আরেকটা প্রশ্ন আমানতের সুরক্ষা নিয়ে। ব্যাংকের আমানত বিমার আওতায় জমার কত টাকা পর্যন্ত নিরাপদ, তার সর্বশেষ সীমা বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রে দেখে নেওয়া ভালো, কারণ এটা সময়ে সময়ে হালনাগাদ হয়। বড় অঙ্কের সঞ্চয় হলে সবটা একটি ব্যাংকে না রেখে ভাগ করে রাখার কথাও ভাবা যায়।
মাঝপথে ডিপিএস ভাঙলে কী হয়
জীবন পরিকল্পনা মেনে চলে না, তাই এই প্রশ্নটা না ভেবে ডিপিএস খোলা ঠিক নয়। নিয়ম ব্যাংকভেদে আলাদা, কিন্তু কিছু প্রবণতা প্রায় সবখানে দেখা যায়। মেয়াদের আগে ভাঙলে অনেক ব্যাংক ঘোষিত হারের বদলে কম হারে মুনাফা দেয়, প্রায়ই সঞ্চয়ী হিসাবের হারের কাছাকাছি। কিছু ব্যাংক নির্দিষ্ট সময়, ধরুন এক বছর, না পেরোলে ভাঙতেই দেয় না, কিংবা বাড়তি কর্তন করে। এর মানে, প্রথম কয়েক বছরের ডিপিএস মূলত তালাবদ্ধ টাকা, ওটার ওপর জরুরি দরকারের ভরসা রাখা ঠিক নয়।
একটা বিকল্প আছে, যেটা অনেকে জানেন না: অনেক ব্যাংক জমা টাকার একটা অংশের বিপরীতে ঋণ দেয়। টাকার দরকার হলে ডিপিএস ভেঙে ফেলার বদলে এই ঋণ নেওয়া কখনো কখনো সস্তা হয়, কারণ ডিপিএস চলতে থাকে আর চক্রবৃদ্ধির সুবিধাটা অক্ষত থাকে। তবে ঋণের সুদের হার আর শর্ত আগে হিসাব করে দেখতে হবে। কখনো ঋণের সুদ ডিপিএসের মুনাফার চেয়ে এতটা বেশি হয় যে ভেঙে ফেলাই সস্তা পড়ে।
মেয়াদ পূর্ণ হলে টাকাটা নিয়ে কী করবেন
পাঁচ বা দশ বছরের অপেক্ষার পর একসঙ্গে বড় একটা অঙ্ক হাতে এলে সেটা ঝোঁকের মাথায় খরচ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। মেয়াদ পূর্তির অন্তত কয়েক মাস আগে ঠিক করে ফেলুন টাকাটা কোন কাজে লাগবে। যদি কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যের জন্য জমিয়ে থাকেন, তাহলে তো কথাই নেই। আর যদি কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকে, তাহলে সেই টাকা এফডিআরে বা নতুন একটা ডিপিএসের ভিত্তি হিসেবে রাখার কথা ভাবতে পারেন, যাতে সঞ্চয়ের ধারাটা ভেঙে না যায়।
নমিনির বিষয়টাও এই সুযোগে বলে রাখি। ডিপিএস খোলার সময় নমিনি ঠিক করা হয়, কিন্তু অনেকেই পরে ভুলে যান। বিয়ে, সন্তানের জন্ম বা পরিবারের কোনো বড় পরিবর্তনের পর নমিনির তথ্য হালনাগাদ আছে কি না, একবার দেখে নেওয়া ভালো। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এই একটা তথ্যই টাকা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ বা জটিল করে দিতে পারে।
ডিপিএস, সঞ্চয়ী, এফডিআর না সঞ্চয়পত্র
সঞ্চয়ের এই চার মাধ্যমকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবলে বিভ্রান্তি বাড়ে। বরং তিনটা আলাদা কাজের জন্য তিনটা আলাদা পাত্র ভাবা সহজ। প্রথম পাত্র সঞ্চয়ী হিসাব, যেখানে জরুরি তহবিল থাকবে, যেকোনো সময় তোলার জন্য। এখানে সুদ কম, তা মেনে নিতে হবে, কারণ আপনি আসলে সুদ নয়, নাগালের সুবিধাটা কিনছেন। দ্বিতীয় পাত্র ডিপিএস, নিয়মিত আয় থেকে আলাদা করে রাখা মাসিক সঞ্চয়ের জন্য, যেটায় হাত দেওয়া কঠিন বলেই কাজের। তৃতীয় পাত্র এফডিআর বা সঞ্চয়পত্র, বাড়তি এককালীন টাকা রাখার জন্য।
সঞ্চয়পত্রের হার ও শর্ত সরকার ঠিক করে এবং সময়ে সময়ে বদলায়। কেনার আগে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য দেখে নিন, কারণ কর, সীমা আর টিআইএনের শর্ত সেখানে আলাদা। এফডিআরের হার ব্যাংকভেদে ভিন্ন, আর অনেক সময় ডিপিএসের কাছাকাছি বা বেশি থাকে। আপনার হাতে একসঙ্গে বড় অঙ্ক থাকলে সেটা ডিপিএসে ভাগ করে ঢালার বদলে এফডিআরে রাখাই সাধারণত যুক্তিসঙ্গত, কারণ ডিপিএসে টাকা ধাপে ধাপে ঢোকে।
ডিপিএস নিয়ে চারটা ধারণা, যেগুলো পুরোপুরি ঠিক নয়
প্রথম ধারণা: “ডিপিএসে কোনো ঝুঁকিই নেই।” কথাটা অর্ধেক সত্য। ব্যাংক সাধারণত সুরক্ষিত মাধ্যম, আর মুনাফার হার আগেই জানা থাকে বলে বাজারের ওঠানামায় অঙ্ক কমে না। কিন্তু আমানত বিমার একটা সীমা আছে, ব্যাংকের সংকটের সম্ভাবনা একেবারে শূন্য নয়, আর মূল্যস্ফীতি নীরবে টাকার ক্রয়ক্ষমতা খেয়ে ফেলে। ঝুঁকি আছে, শুধু ধরনটা শেয়ারবাজারের মতো দৃশ্যমান নয়।
দ্বিতীয় ধারণা: “যে ব্যাংকে হার বেশি, সেটাই সেরা।” এটা সবসময় সত্য নয়। বেশি হারের সঙ্গে হয়তো কঠিন অকাল সমাপ্তির শর্ত, বেশি জরিমানা বা সীমিত শাখা থাকতে পারে। সব শর্ত মিলিয়ে দেখলে একটু কম হারের অন্য ব্যাংকই আপনার জন্য ভালো হতে পারে। তৃতীয় ধারণা: “ডিপিএস ভাঙলে সব টাকা নষ্ট হয়।” না, নষ্ট হয় না। আপনার জমা টাকা ফেরত পান, শুধু মুনাফাটা কম হারে হিসাব হয় এবং কখনো কিছু কর্তন থাকে। ক্ষতির পরিমাণ বুঝতে ব্যাংকের কাছে আগেই লিখিত নিয়ম চেয়ে নেওয়া ভালো।
চতুর্থ ধারণা: “ডিপিএস শুধু চাকরিজীবীদের জন্য।” ফ্রিল্যান্সার, ছোট ব্যবসায়ী, গৃহিণী, শিক্ষার্থী, যাঁর আয় নিয়মিত কিন্তু ছোট, সবার জন্যই কিস্তি ৫০০ টাকা থেকে শুরু করার সুযোগ আছে। আসল শর্ত পেশা নয়, ধারাবাহিকতা।
ডিপিএস যাঁদের জন্য নয়
ডিপিএসের গুণগান অনেক শোনা যায়। কিন্তু এমন কিছু অবস্থা আছে, যেখানে এটা আমার মতে ঠিক পছন্দ নয়, আর সেই কথাগুলো কম বলা হয়।
যাঁর হাতে এখনো জরুরি তহবিল নেই, তিনি আগে সেটা গড়ুন। কারণ হঠাৎ অসুখ বা চাকরি হারানোর মতো পরিস্থিতিতে ডিপিএসের টাকা কাজে আসে না, উল্টো ভাঙতে গিয়ে লোকসান হয়। যাঁর ওপর চড়া সুদের ঋণ আছে, বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া, তিনি আগে সেটা শোধ করুন। ডিপিএসে ৮ শতাংশ মুনাফা পাওয়া আর ক্রেডিট কার্ডে তার চেয়ে অনেক বেশি সুদ গোনা একসঙ্গে চালালে অঙ্কে আপনি পিছিয়েই পড়েন। আর যাঁর আয় এতটাই অনিয়মিত যে মাসের কিস্তি নিয়মিত দেওয়া কঠিন, তাঁর জন্য খুব ছোট কিস্তিতে শুরু করা বা আপাতত সঞ্চয়ী হিসাবেই নিয়ম করে জমানো বেশি বাস্তবসম্মত।
শেষ একটা হিসাব সবাইকে করতে বলব। আপনার ডিপিএসের মুনাফার হারের পাশে মূল্যস্ফীতির হারটা রাখুন। মুনাফা যদি মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হয়, তাহলে মেয়াদ শেষে টাকার অঙ্ক বাড়লেও সেই টাকায় কেনা যায় কম জিনিস। ডিপিএস তখনো সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে, কিন্তু সম্পদ বাড়ায় না। সে কারণে একে নিজের একমাত্র পরিকল্পনা না বানিয়ে বড় ছবির একটা অংশ হিসেবে দেখাই ভালো।
তথ্য যেখান থেকে: লেখার হার ও কর সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন, বিভিন্ন ব্যাংকের হার সংকলন ও করসংক্রান্ত সরকারি নীতির প্রকাশিত বিবরণ থেকে নেওয়া। নিজের অংশটুকু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে ব্যাংকের অফিসিয়াল শাখা বা ওয়েবসাইট, বাংলাদেশ ব্যাংক (bb.org.bd), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (nbr.gov.bd) ও জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য দেখে নিন।

[…] ডিপিএস কী? ২০২৬ সালে নিয়ম, সুদের হার ও… […]