২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার আগের মতোই থাকছে, অর্থাৎ বাড়েনি, কমেওনি। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য ও ২ জুলাইয়ের সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী স্কিমভেদে সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১.৮২ থেকে ১১.৯৮ শতাংশের মধ্যে। নিচের টেবিলে আলাদা আলাদা স্কিমের হার দেওয়া হলো।
| সঞ্চয়পত্রের ধরন | মুনাফার হার (জুলাই–ডিসেম্বর ২০২৬) |
|---|---|
| তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র | ১১.৮২% |
| পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র | ১১.৮৩% |
| পরিবার সঞ্চয়পত্র (পূর্ণ মেয়াদে) | ১১.৯৩% |
| পেনশনার সঞ্চয়পত্র (সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে, পঞ্চম বছর শেষে) | ১১.৯৮% |
একটা জিনিস টেবিল দেখেই বুঝে ফেলা ভালো: এগুলো সর্বোচ্চ হার, আর কয়েকটির ক্ষেত্রে হার নির্ভর করে আপনি কত টাকা বিনিয়োগ করছেন এবং কত বছর ধরে রেখেছেন তার ওপর। সরকার সঞ্চয়পত্রের হার বছরে দুবার ঠিক করে, ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন এবং ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর। তাই এই সংখ্যাগুলো ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত মেনে চলবে। এর পর কী হবে, সে কথায় শেষে আসছি, কারণ গত জানুয়ারির একটা ঘটনা এই বিষয়ে আপনার ধারণা বদলে দিতে পারে।
কিন্তু শুধু হারটা জানলেই সঞ্চয়পত্র কেনার সিদ্ধান্ত ঠিক হয় না। ১১.৮২ শতাংশ শুনতে যত আকর্ষণীয়, হাতে আসা অঙ্কটা তত না-ও হতে পারে। কর কাটে, টাকা কতদিন আটকে থাকবে সেটা ধরতে হয়, আর কোন স্কিম আপনার জীবনের কোন অবস্থায় মানায়, সেটাও ভাবতে হয়। সেগুলোই ধরে ধরে দেখা যাক।
আপনি আসলে কী চাইছেন, সেটা আগে ঠিক করুন
সঞ্চয়পত্র কেনার আগে একটাই প্রশ্ন ঠিক করে নেওয়া দরকার। আপনি কি নিয়মিত একটা আয় চান, নাকি আপনার টাকাটা বছর বছর বাড়তে থাকুক, তা-ই চান? উত্তরটা কোন স্কিম আপনার জন্য, তা অনেকটাই ঠিক করে দেয়।
যদি প্রতি তিন মাসে নিয়মিত একটা অঙ্ক চান
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র এই কাজের জন্য। এর মূল্যমান ১ লাখ, ২ লাখ, ৫ লাখ ও ১০ লাখ টাকার, অর্থাৎ ছোট অঙ্কে শুরু করার সুযোগ কম, ন্যূনতম এক লাখ টাকা লাগে। একক নামে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা এবং যুগ্ম নামে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত কেনা যায়। মুনাফা আসে প্রতি তিন মাস পর পর, তাই যাঁর মাসিক বা ত্রৈমাসিক খরচ চালাতে এই টাকার দরকার, তাঁর জন্য এটি মানানসই।
একটা সাধারণ হিসাব দেখুন। ১১.৮২ শতাংশ হারে ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে বছরে মোট মুনাফা দাঁড়ায় ৫৯,১০০ টাকা, অর্থাৎ প্রতি তিন মাসে প্রায় ১৪,৭৭৫ টাকা (কর কাটার আগে)। কর কাটার পরের হিসাবটা একটু পরে কর অংশে দেখাচ্ছি।
যদি অল্প অল্প অঙ্কে ঢুকতে চান
সবার হাতে এক লাখ টাকা একসঙ্গে থাকে না। পরিবার সঞ্চয়পত্রের মূল্যমান ১০,০০০ টাকা থেকে শুরু, তারপর ২০,০০০, ৫০,০০০, ১ লাখ, ২ লাখ, ৫ লাখ ও ১০ লাখ। তাই যাঁর হাতে মাত্র কয়েক হাজার টাকা অতিরিক্ত আছে, তিনিও এখানে জায়গা পান। পূর্ণ মেয়াদে এই স্কিমের হার ১১.৯৩ শতাংশ, আর মুনাফা মাসে মাসে তুলে নেওয়ার ব্যবস্থাও আছে। ক্রেতার মৃত্যুর পর নমিনি চাইলে সঞ্চয়পত্র সঙ্গে সঙ্গে ভাঙিয়ে টাকা নিতে পারেন, কিংবা মেয়াদ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত মাসে মাসে মুনাফা তুলে যেতে পারেন।
তবে একটা পার্থক্য মাথায় রাখুন। সঞ্চয়পত্র কেনা হয় একসঙ্গে টাকা দিয়ে। আপনার আয় যদি মাসে মাসে আসে আর আপনি প্রতি মাসেই কিছু কিছু জমাতে চান, তাহলে সেটা সঞ্চয়পত্রের কাজ নয়, সেটা ডিপিএসের কাজ। এই বিষয়ে বিস্তারিত দেখতে পারেন ডিপিএস নিয়ে আমার আগের লেখায়।
যদি অবসরে থাকেন
পেনশনার সঞ্চয়পত্র অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য আলাদা করে সাজানো। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে পঞ্চম বছর শেষে মুনাফার হার ১১.৯৮ শতাংশ, যেটা সব স্কিমের মধ্যে সর্বোচ্চ। সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে হার তুলনায় কম। ধরুন কেউ ৭ লাখ টাকা এই স্কিমে রাখলেন, তাহলে কর কাটার আগে বছরে মুনাফা দাঁড়ায় প্রায় ৮৩,৮৬০ টাকা। কারা এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন এবং কী কাগজপত্র লাগবে, সেই শর্ত জেলা সঞ্চয় অফিস থেকে নিশ্চিত হয়ে নেওয়াই ঠিক।
যদি বড় অঙ্ক পাঁচ বছর ফেলে রাখতে পারেন
পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র আর পূর্ণ মেয়াদের পরিবার সঞ্চয়পত্র, দুটোই এই ধরনের মানুষের জন্য, যাঁর টাকার তাৎক্ষণিক দরকার নেই এবং যিনি মেয়াদ শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে প্রস্তুত। দীর্ঘ মেয়াদের সুবিধা হলো, হারটা মোটামুটি স্থির থাকে এবং বারবার নতুন করে বিনিয়োগ বেছে নেওয়ার ঝামেলা নেই। সাধারণত কেনার সময়ের হারই সেই সঞ্চয়পত্রের জন্য প্রযোজ্য থাকে, তবে নিশ্চিত হতে সঞ্চয় অফিসে জিজ্ঞেস করে নিন।
হার এত বেশি কেন, আর এটা কতদিন থাকবে
সঞ্চয়পত্র কেনার মানে হলো আপনি সরকারকে ধার দিচ্ছেন, আর সরকার সেই ধারের বিনিময়ে আপনাকে মুনাফা দিচ্ছে। সরকার যে হারে মুনাফা দেয়, সেটা তার ঋণের খরচ। হার যত বেশি, সরকারের খরচও তত বেশি। এ কারণে হার নিয়ে সরকারের ভেতরেই টানাপোড়েন থাকে। একদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীর, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্তদের, আয়ের নিরাপত্তা, অন্যদিকে সরকারের ঋণের বোঝা।
এবার ব্যাংকের দিকটা দেখুন। এ বছর বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক খাতে অলস তারল্য বেশি আর বেসরকারি ঋণ নেওয়ার চাহিদা কম। যে ব্যাংকের হাতে টাকা পড়ে আছে, সে নতুন আমানতের জন্য উঁচু হার দিতে নাও আগ্রহী হতে পারে। এই কারণে ব্যাংকের আমানতের হারের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের হারের ফারাক বেশি দেখাচ্ছে। এটা আমার বিশ্লেষণ, সরকারি ঘোষণা নয়, কিন্তু এই ফারাকটাই অনেকের কাছে সঞ্চয়পত্রকে আকর্ষণীয় করে তুলছে।
তাহলে এই হার কতদিন থাকবে? কেউ নিশ্চিত বলতে পারে না। হার বছরে দুবার পর্যালোচনা হয় বলে প্রতিটি ছয় মাসই একটা সম্ভাব্য বদলের সুযোগ। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার সময় ধরে নেবেন না যে আজকের হারে আপনি বছরের পর বছর নতুন করে কিনতে পারবেন। কেনা সঞ্চয়পত্রের হার স্থির থাকে, কিন্তু আগামী বছর আবার কিনতে গেলে হার ভিন্ন হতে পারে।
মুনাফা যা লেখা, হাতে আসে তার চেয়ে কম: উৎসে কর
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে সরকার উৎসে কর কেটে রাখে। প্রকাশিত নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও পরিবার সঞ্চয়পত্রে সর্বমোট ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ হারে, আর এর বেশি বিনিয়োগে ১০ শতাংশ হারে কর কাটা হয়। ব্যাংকের এফডিআর বা ডিপিএসে টিআইএন না থাকলে কর ১৫ শতাংশ হয়, সঞ্চয়পত্রে এই কাঠামো আলাদা। নিচের টেবিলে ১১.৮২ শতাংশ হারের তিন মাস অন্তর স্কিমের তিনটা বিনিয়োগের হিসাব দেখুন।
| বিনিয়োগ | বছরে মোট মুনাফা | কর | নিট বার্ষিক মুনাফা | প্রতি তিন মাসে নিট |
|---|---|---|---|---|
| ১ লাখ টাকা | ১১,৮২০ টাকা | ৫% (৫৯১ টাকা) | ১১,২২৯ টাকা | প্রায় ২,৮০৭ টাকা |
| ৫ লাখ টাকা | ৫৯,১০০ টাকা | ৫% (২,৯৫৫ টাকা) | ৫৬,১৪৫ টাকা | প্রায় ১৪,০৩৬ টাকা |
| ১০ লাখ টাকা | ১,১৮,২০০ টাকা | ১০% (১১,৮২০ টাকা) | ১,০৬,৩৮০ টাকা | প্রায় ২৬,৫৯৫ টাকা |
এই হিসাবে আমি ধরে নিয়েছি, কর পুরো মুনাফার ওপর একই হারে প্রযোজ্য। বাস্তবে আপনার মোট বিনিয়োগ একাধিক সঞ্চয়পত্রে ভাগ করা থাকলে বা আগে থেকে সঞ্চয়পত্র থাকলে হিসাব কীভাবে হবে, তা সঞ্চয় অফিসে জিজ্ঞেস করে নিন। এখানে লক্ষ করার মতো ব্যাপার হলো, ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে ৫ লাখ টাকার দ্বিগুণ নিট মুনাফা আসে না। কর ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উঠে যাওয়ায় ১০ লাখে নিট মুনাফা ১,০৬,৩৮০ টাকা, ৫ লাখের নিট মুনাফার (৫৬,১৪৫ টাকা) দ্বিগুণের চেয়ে সামান্য কম।
নিজে হিসাব করার সূত্রটা সহজ: নিট বার্ষিক মুনাফা = বিনিয়োগের অঙ্ক × মুনাফার হার × (১ − করের হার)। যেমন ৩ লাখ টাকা তিন মাস অন্তর সঞ্চয়পত্রে রাখলে কর কাটার আগে মুনাফা ৩,০০,০০০ × ১১.৮২% = ৩৫,৪৬০ টাকা। ৫ শতাংশ কর ১,৭৭৩ টাকা কাটলে নিট থাকে ৩৩,৬৮৭ টাকা। এই সূত্র দিয়ে যেকোনো অঙ্ক আর যেকোনো স্কিমের হার বসিয়ে মোটামুটি নিট প্রাপ্তি বের করা যায়। চক্রবৃদ্ধির মতো জটিল হিসাব লাগলে চক্রবৃদ্ধি সুদ ক্যালকুলেটর কাজে আসবে।
টিআইএনের বিষয়েও একটা কথা। বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি হলে সঞ্চয়পত্র কেনার সময় টিআইএন চাওয়ার নিয়ম আছে। বর্তমান সীমা কত, সেটা কেনার আগে জেলা সঞ্চয় অফিস বা ব্যাংক থেকে জেনে নেওয়াই নিরাপদ, কারণ এই সীমা বাজেটে বদলে যেতে পারে। কর নিয়ে আরও হিসাব করতে চাইলে আমাদের আয়কর ক্যালকুলেটর একটা মোটামুটি ধারণা দিতে পারে।
একটা বাস্তব কাজের কথা: প্রতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে যে উৎসে কর কাটা হয়, তার প্রত্যয়নপত্র জেলা সঞ্চয় অফিস বা ব্যুরো থেকে বিতরণ করা হয়। আপনি যদি আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন, এই প্রত্যয়নপত্র আপনার কাজে লাগবে, কারণ কাটা করের প্রমাণ হিসেবে এটা জমা দিতে হয়। তাই কাগজটা হারিয়ে না ফেলে সংগ্রহ করে রাখুন।
১১.৮২ শতাংশ আসলে কতটা: মূল্যস্ফীতির পাশে রেখে
কর কাটার পর আপনার প্রকৃত নিট হার কত দাঁড়াল, সেটা বের করা সহজ। ১১.৮২ শতাংশ হারে ৫ শতাংশ কর কাটলে নিট হার হয় প্রায় ১১.২৩ শতাংশ, আর ১০ শতাংশ কর কাটলে প্রায় ১০.৬৪ শতাংশ। এবার এর পাশে মূল্যস্ফীতিটা রাখুন। ধরুন মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ (এটা কেবল উদাহরণ, প্রকৃত হার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যে দেখে নিন)। তাহলে ৫ শতাংশ করের ক্ষেত্রে আপনার টাকার ক্রয়ক্ষমতা বাস্তবে বাড়ছে প্রায় ২ শতাংশ, আর ১০ শতাংশ করের ক্ষেত্রে প্রায় দেড় শতাংশ।
এই হিসাব দেখিয়ে আমি আপনাকে হতাশ করতে চাই না, বরং একটা বাস্তব ছবি দিতে চাই। সঞ্চয়পত্র আপনার টাকাকে মূল্যস্ফীতির চেয়ে কিছুটা এগিয়ে রাখে, এটাই এর বড় সুবিধা। কিন্তু সেই এগিয়ে থাকার পরিমাণ হার যত বড় দেখায়, তার চেয়ে অনেক ছোট। তাই সঞ্চয়পত্রে রেখে মূল্যস্ফীতির সময়ে আপনার ক্রয়ক্ষমতা মোটামুটি ঠিক রাখা সম্ভব, কিন্তু রাতারাতি সম্পদ বাড়ানোর আশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
ব্যাংকের এফডিআরের পাশে রাখলে
সঞ্চয়পত্র আর ব্যাংকের স্থায়ী আমানত, দুটোই এককালীন টাকা রাখার জায়গা। তুলনা করার সবচেয়ে সোজা উপায় হলো একই অঙ্ক দুই জায়গায় রেখে নিট ফলাফল দেখা। ধরুন আপনার ৫ লাখ টাকা আছে। এফডিআরে ৯ শতাংশ হার পেলে (এটা উদাহরণ, কোনো ব্যাংকে এর বেশিও থাকতে পারে) বছরে মুনাফা ৪৫,০০০ টাকা, ১০ শতাংশ কর কাটার পর হাতে থাকে ৪০,৫০০ টাকা। একই ৫ লাখ টাকা তিন মাস অন্তর সঞ্চয়পত্রে রাখলে ওপরের হিসাবে নিট মুনাফা ৫৬,১৪৫ টাকা। ব্যবধান ১৫,৬৪৫ টাকা। এফডিআরে ১১ শতাংশও পেলে নিট মুনাফা দাঁড়ায় ৪৯,৫০০ টাকা, তবু সঞ্চয়পত্র প্রায় ৬,৬৪৫ টাকা এগিয়ে থাকে।
তাহলে কি সবাই সঞ্চয়পত্রই কিনবেন? না, কারণ এই তুলনায় হার ছাড়া আরও কিছু আছে। ব্যাংকের এফডিআর যেকোনো অঙ্কে খোলা যায়, কিন্তু সঞ্চয়পত্রে কেনার ঊর্ধ্বসীমা আছে এবং কিছু স্কিমে ন্যূনতম অঙ্ক বেশি। এফডিআর ভাঙার নিয়ম ব্যাংকভেদে আলাদা, সঞ্চয়পত্র ভাঙার নিয়ম সরকার ঠিক করে। আর সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো ঝুঁকির ধরনে। সঞ্চয়পত্র সরকার ইস্যু করে, তাই এখানে ব্যাংক ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি নেই। কিন্তু সরকারের নীতি বদলে হার বা শর্ত পাল্টে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। ওই ঝুঁকিটা কেমন, সে কথাই সবশেষে বলব।
১০ লাখ টাকা হাতে এলে: একটা ভাগ করে দেখা
ধরা যাক, কারও হাতে হঠাৎ ১০ লাখ টাকা এল, জমি বিক্রি বা অবসরের পাওনা থেকে। তিনি কী করবেন? সব টাকা সঞ্চয়পত্রে ঢেলে দেওয়াটা সবচেয়ে সহজ মনে হয়, কিন্তু আমার কাছে একটা ভাগ-করা পরিকল্পনা বেশি যুক্তিসঙ্গত লাগে। ২ লাখ টাকা সঞ্চয়ী হিসাবে রাখুন, যেটা জরুরি তহবিল, যেকোনো সময় তোলার জন্য। বাকি ৮ লাখ টাকার মধ্যে ৫ লাখ তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে, আর ৩ লাখ পরিবার সঞ্চয়পত্রে।
এই ভাগে কর কাটার আগে বছরে মুনাফা আসে ৫ লাখে ৫৯,১০০ টাকা আর ৩ লাখে (১১.৯৩% হারে) ৩৫,৭৯০ টাকা, মোট ৯৪,৮৯০ টাকা। যেহেতু মোট সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগ ৫ লাখ পেরিয়ে ৮ লাখ হয়ে গেল, তাই ধরে নিচ্ছি ১০ শতাংশ কর প্রযোজ্য। কর কাটে ৯,৪৮৯ টাকা, নিট থাকে ৮৫,৪০১ টাকা। এখানে চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো, পরিবার সঞ্চয়পত্রের ৩ লাখ টাকা যুক্ত করায় আগে যে ৫ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ কর কাটত, এখন ৮ লাখ মিলিয়ে সবটাতেই ১০ শতাংশ কাটতে পারে। অর্থাৎ বিনিয়োগ বাড়ালে কর নিয়ে হিসাবও বদলে যায়। এই কারণে কেনার আগে সঞ্চয় অফিসে জিজ্ঞেস করুন, আপনার ক্ষেত্রে কর কীভাবে গণনা হবে।
একটা সতর্কতা: কর কমানোর জন্য নিজের টাকা অন্য কারও নামে কেনার চিন্তা অনেকের মাথায় আসে। যাঁর টাকা, তাঁর নামেই সঞ্চয়পত্র থাকা উচিত। টাকার প্রকৃত মালিক ও সঞ্চয়পত্রের নামের মধ্যে মিল না থাকলে পরে আয়কর বা অন্য দিক থেকে জটিলতা হতে পারে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে কথা বলুন।
তিন মাসের মুনাফা হাতে এলে: বাজেটে বসিয়ে দেখুন
তিন মাস অন্তর সঞ্চয়পত্রের মুনাফা মানে প্রতি কয়েক মাসে একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক হাতে আসা। ধরুন ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থেকে নিট ১৪,০৩৬ টাকা এল। এটা নিয়ে কী করবেন? সবচেয়ে সহজ কাজ হলো সংসারের খরচে মিলিয়ে ফেলা। কিন্তু একটা ভাগ-করা পরিকল্পনা অনেক বেশি কাজের।
উদাহরণস্বরূপ, ১৪,০৩৬ টাকার মধ্যে প্রায় ৬,০০০ টাকা সংসারের নিয়মিত খরচে, ৪,০০০ টাকা একটা ডিপিএসের মাসিক কিস্তির জন্য আলাদা করে রাখা (অর্থাৎ মুনাফাই ডিপিএসের টাকার জোগান দিচ্ছে), আর বাকি প্রায় ৪,০০০ টাকা জরুরি তহবিলে। এভাবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কেবল খরচ হয়ে যায় না, বরং নতুন সঞ্চয়ের উৎস হয়ে ওঠে। অনুপাতটা আপনার পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলে নিন। আসল কথা হলো, মুনাফা হাতে আসার আগেই ঠিক করে ফেলুন সেটা কোথায় যাবে।
মুনাফা কীভাবে আসে, কে তোলে
সঞ্চয়পত্র কিনলে আপনার হাতে একটা সঞ্চয়পত্র বা ডিজিটাল রেকর্ড আসে, আর মুনাফা সাধারণত আপনার দেওয়া ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। তাই কেনার সময় এমন একটা ব্যাংক হিসাব দিন, যেটা আপনি নিয়মিত ব্যবহার করেন এবং যেটা সচল থাকবে। হিসাব নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে বা তথ্য ভুল থাকলে মুনাফা জমা পড়তে সমস্যা হতে পারে, আর তখন সঞ্চয় অফিসে গিয়ে ঠিক করাতে সময় চলে যায়।
মনে রাখার মতো আরেকটা বিষয় হলো যুগ্ম নামে কেনা। স্বামী-স্ত্রী বা পরিবারের দুজন মিলে যুগ্ম নামে কিনলে ক্রয়সীমা বাড়ে (তিন মাস অন্তর স্কিমে ৬০ লাখ পর্যন্ত), কিন্তু সঞ্চয়পত্রের মালিকানা, মুনাফা তোলার অধিকার এবং ভবিষ্যতে একজনের মৃত্যু হলে কী হবে, এই বিষয়গুলো আগেই পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। এমন প্রশ্নে সঞ্চয় অফিসের কর্মকর্তার কাছ থেকে লিখিত নিয়ম চেয়ে নিন।
কোথায় কিনবেন, কী নিয়ে যাবেন
সঞ্চয়পত্র কেনা বা ভাঙানো যায় জেলা সঞ্চয় অফিস, জাতীয় সঞ্চয় বিশেষ ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ডাকঘর থেকে। কোন জায়গায় কোন সঞ্চয়পত্র পাওয়া যায়, তা সবসময় একরকম নয়। তাই সরাসরি যাওয়ার আগে ফোন করে বা অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেখে নিলে সময় বাঁচে।
কিনতে যাওয়ার সময় সঙ্গে রাখুন:
- জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল কপি ও ফটোকপি
- পাসপোর্ট সাইজের ছবি (নিজের ও নমিনির)
- নমিনির পরিচয় ও সম্পর্কের তথ্য
- ব্যাংক হিসাবের বিবরণ, যেখানে মুনাফা জমা হবে
- টিআইএন সার্টিফিকেট, যদি আপনার থাকে বা বিনিয়োগের অঙ্ক বেশি হয়
নমিনির তথ্যটা ভুল করলে পরে বিপাকে পড়তে হয়, তাই লিখে দেওয়ার আগে নামের বানান ও সম্পর্ক ভালো করে মিলিয়ে নিন। আর যে কাগজ বা সঞ্চয়পত্রের বই আপনাকে দেওয়া হবে, সেটা হারালে ঝামেলা অনেক, তাই নিরাপদ জায়গায় রাখুন এবং একটা ছবি তুলে রাখুন।
কেনার পর একটা ছোট স্প্রেডশিট বা নোটে প্রতিটি সঞ্চয়পত্রের তথ্য টুকে রাখুন: কোন স্কিম, কত টাকার, কেনার তারিখ, মেয়াদ শেষের তারিখ, হার, নমিনি কে আর কোথা থেকে কেনা। মুনাফা যে ব্যাংক হিসাবে আসছে তার নামও লিখে রাখুন। কয়েক বছর পর, বিশেষ করে একাধিক সঞ্চয়পত্র থাকলে, এই একটা পাতাই আপনার অনেক সময় ও দুশ্চিন্তা বাঁচাবে।
মেয়াদের আগে টাকা তুলতে হলে
সঞ্চয়পত্র মেয়াদের আগে ভাঙানো যায়, কিন্তু তাতে সাধারণত মুনাফার হার কমে যায়। কত কমবে, তা নির্ভর করে স্কিম আর আপনি কতদিন ধরে রেখেছেন তার ওপর। সাধারণত যত আগে ভাঙবেন, ক্ষতি তত বেশি। এই কারণে এমন টাকা সঞ্চয়পত্রে রাখা ঠিক নয়, যেটা আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে লাগতে পারে। আপনার নির্দিষ্ট সঞ্চয়পত্রে মেয়াদের আগে ভাঙলে কত পাবেন, সেটা কেনার সময়ই সঞ্চয় অফিসের কাছ থেকে জেনে নিন।
টাকা কম থাকলে, সঞ্চয়পত্রে পৌঁছানোর আগের তিন ধাপ
এই লেখা পড়ে অনেকে হয়তো ভাবছেন, ১২ শতাংশের কাছাকাছি হার, তাহলে এখনই কেন নয়। কিন্তু সবার হাতে এককালীন বড় অঙ্ক থাকে না। যাঁর আয় এখনো শুরুই হচ্ছে, বা যিনি মাসে মাসে অল্প অল্প জমাচ্ছেন, তাঁর জন্য একটা ধাপে ধাপে পথ আছে, যেটা সঞ্চয়পত্রের দিকে এগোনোর সিঁড়ির মতো।
প্রথম ধাপ হলো একটা জরুরি তহবিল, যা সঞ্চয়ী হিসাবে থাকবে এবং আপনার অন্তত কয়েক মাসের প্রয়োজনীয় খরচ ঢাকবে। এটা ছাড়া অন্য সব সঞ্চয় ঝুঁকিতে থাকে, কারণ হঠাৎ দরকারে আপনাকে সেগুলোই ভাঙতে হবে। দ্বিতীয় ধাপ হলো নিয়ম করে মাসিক সঞ্চয়, অর্থাৎ ডিপিএসের মতো কিছু, যেটা আপনাকে জমানোর অভ্যাস গড়ে দেয় এবং ধাপে ধাপে একটা অঙ্ক তৈরি করে। তৃতীয় ধাপে, যখন আপনার হাতে এককালীন অঙ্ক জমে যায়, তখন সেটা সঞ্চয়পত্র বা এফডিআরে রাখার সিদ্ধান্ত নিন।
এই ক্রমটা মেনে চললে সঞ্চয়পত্র আপনার পরিকল্পনার একটা সুসংহত অংশ হয়ে ওঠে, ঝোঁকের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত থাকে না। সঞ্চয়পত্রের উঁচু হার সত্যিই আকর্ষণীয়, কিন্তু তার আগের ধাপগুলো ছাড়া সেই হারের পেছনে ছোটাটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
হারের চেয়ে কঠিন প্রশ্নটা: টাকাটা কতদিন আটকে থাকবে
সঞ্চয়পত্র নিয়ে আলোচনায় প্রায় সবাই হার নিয়ে কথা বলেন, কিন্তু আসল প্রশ্নটা হলো তারল্য, অর্থাৎ দরকারের সময় টাকাটা কত সহজে হাতে পাবেন। ১১.৯ শতাংশ হার দেখে সব সঞ্চয় এখানে ঢেলে দিলে হঠাৎ অসুখ, বিয়ে বা ব্যবসার প্রয়োজনে টাকা তুলতে গেলে কম হারে নগদায়ন করতে হতে পারে। আপনার মোট সঞ্চয়ের একটা অংশ, যেটা অন্তত ৩-৫ বছর না লাগার নিশ্চয়তা আছে, সেটাই এখানে মানায়।
আরেকটা হিসাব মূল্যস্ফীতির সঙ্গে। মুনাফার হার যত বেশিই হোক, মূল্যস্ফীতি তার কাছাকাছি বা বেশি হলে টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা তেমন বাড়ে না। তাই কর কাটার পর আপনার নিট প্রাপ্তির হার কত, আর বর্তমান মূল্যস্ফীতি কত, দুটো পাশাপাশি রেখে দেখুন। সঞ্চয়পত্র নিরাপদ, কিন্তু কেবল নিরাপদ হওয়াই যথেষ্ট নয়।
সঞ্চয়পত্রে যে ভুলগুলো ছোট দেখায়, কিন্তু ভারী পড়ে
বাছাই করা স্কিম সঠিক হলেও কিছু অসতর্কতা আপনার প্রাপ্তি কমিয়ে দিতে পারে। এগুলো মাথায় থাকলে অনেক ঝামেলা এড়ানো যায়।
প্রথম ভুল হলো মেয়াদের তারিখ ভুলে যাওয়া। সাধারণত মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সঞ্চয়পত্রে আর মুনাফা চলে না। অথচ টাকাটা সঞ্চয় অফিসে বা ব্যাংকে পড়ে থাকে, আর আপনি ভাবতে থাকেন মুনাফা আসছে। ফোনের ক্যালেন্ডারে মেয়াদ শেষের তারিখের কয়েক সপ্তাহ আগে একটা রিমাইন্ডার সেট করে রাখুন। দ্বিতীয় ভুল হলো পুরোনো হারের কথা শুনে নতুন সময়ে কিনতে যাওয়া। কেউ হয়তো বলেছেন “আমি ১২ শতাংশে কিনেছিলাম”, কিন্তু আজ কিনলে কত পাবেন, সেটা আজকের ঘোষিত হারেই ঠিক হবে। তৃতীয় ভুল হলো নমিনির তথ্য আপডেট না করা। বিয়ে, সন্তানের জন্ম বা পরিবারে কোনো বড় পরিবর্তনের পর নমিনি বদলাতে হতে পারে। চতুর্থ ভুল হলো কাগজপত্র ও সঞ্চয়পত্রের তথ্য হারিয়ে ফেলা, যার ফলে ভাঙানোর সময় অতিরিক্ত সময় ও ঝামেলা পোহাতে হয়। পঞ্চম ভুল হলো মুনাফাকে “বাড়তি আয়” ভেবে খরচ করে ফেলা। তিন মাস অন্তর টাকা হাতে এলে সেটা খরচ করা সহজ, তাই মুনাফার একটা অংশ আলাদা করে আবার জমানোর অভ্যাস করুন।
ডিসেম্বরের সেই প্রজ্ঞাপন, আর কেন একটা হার মুখস্থ করা ঠিক নয়
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে সরকার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করল। তাতে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমিয়ে দেওয়া হলো। সাধারণ মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের যে বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ভরসা করে সংসার চালান, তাঁরা বিপাকে পড়লেন। কিছুদিনের মধ্যেই, জানুয়ারির শুরুতে, সরকার সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করল এবং আগের হারই বহাল রাখল। ছয় মাস পর, ২ জুলাই, জুলাই থেকে ডিসেম্বরের জন্যও একই হার রাখা হলো।
গল্পটার ভালো দিকটা হলো, শেষ পর্যন্ত হার কমেনি। কিন্তু শিক্ষাটা অন্য জায়গায়: একটা সময় সত্যিই হার কমানোর প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল, মাত্র কিছুদিনের জন্য হলেও। ঠিক এ কারণে এই লেখার সংখ্যাগুলো আমি ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর হার হিসেবে লিখেছি, চিরস্থায়ী হিসেবে নয়। আপনি যখন এই লেখা পড়ছেন, হয়তো নতুন ছয় মাসের হার ঘোষিত হয়ে গেছে। কেনার আগে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট বা জেলা সঞ্চয় অফিসে হালনাগাদ হার একবার দেখে নিন। নিজের পরিকল্পনা তৈরি করার সময় হারটাকে একটা অনুমান হিসেবে ধরুন, নিশ্চয়তা হিসেবে নয়।
তথ্য যেখান থেকে: হারের তথ্য জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রকাশিত পাতা ও জুলাই ২০২৬-এর সংবাদ প্রতিবেদন (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৪আপডেটনিউজ), জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রথম আলোর প্রতিবেদন এবং জেলা সঞ্চয় অফিসের প্রকাশিত নোটিশ থেকে নেওয়া। করের হার জেলা সঞ্চয় অফিসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী। আপনার সিদ্ধান্তের আগে nationalsavings.gov.bd এবং আপনার জেলা সঞ্চয় অফিসের সর্বশেষ তথ্য দেখে নিন।
